আমরা অনেকসময়ই শুনে থাকি ভিটামিন সি আমাদের শরীরে খুবই প্রয়োজন। তবে প্রায় অনেকেই জানেন না এটির ঠিক কি কি উপকারিতা বা কি এর গুণ। এখন পৃথিবী জুড়ে যে করোনা ভাইরাসের মহামারী চলছে, তার থেকে বাঁচতে হয়তো অনেকেই ভিটামিন সি -এর সাপ্লিমেন্ট খাচ্ছেন। তবে এর সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নেই। তাই আমাদের এই প্রতিবেদনে ভিটামিন সি- এর উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হল।

Table Of Contents

  • ভিটামিন সি- এর অভাব বলতে কি বোঝায় ?
  • ভিটামিন সি- এর উপকারিতা
  • ভিটামিন সি এর ঘাটতি প্রতিরোধ কিভাবে করবেন ?

ভিটামিন সি- এর অভাব বলতে কি বোঝায় ?

যখন শরীরে ভিটামিন সি – এর ঘাটতি হয়, তখনই ভিটামিন সি এর অভাব দেখা যায়। এর কারণ নিচে উল্লেখ করা হল।

ভিটামিন সি- এর অভাবের কারণ

ভিটামিন সি যুক্ত খাবার সঠিক পরিমানে না খেলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

শরীরে ভিটামিন সি- এর অভাবের লক্ষণ

  • মাড়ি ফুলে যাওয়া বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া
  • শরীরে কোনো ক্ষত হলে তা সারতে দেরি হওয়া
  • শুষ্ক চুল ও স্প্লিট এন্ডের সমস্যা
  • শুষ্ক ও রুক্ষ ত্বক
  • নাক ফুলে যাওয়া বা নাক থেকে রক্ত পড়া
  • দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
  • গাঁটে গাঁটে ব্যথা বা ফুলে যাওয়া
  • ওজন বৃদ্ধি পাওয়া।

ভিটামিন সি- এর উপকারিতা

১. হার্টের স্বাস্থ্য উন্নত করে

আমেরিকার এক গবেষণা অনুসারে, ভিটামিন সি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। একাধিক সমীক্ষা প্রমাণ করেছে যে ভিটামিন সি এর উচ্চ প্লাসমার পরিমান হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর সাথে যোগাযোগ থাকতে পারে (1) । আর এক সমীক্ষায় জানা যায় যে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ নিরামিষ ডায়েট রক্তের কোলেস্টেরলকে ১% হ্রাস করতে পারে, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ২% কমাতে সাহায্য করে (2)

২. ব্লাড প্রেসার সঠিক রাখে

জনস হপকিন্স মেডিসিনের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ভিটামিন সি রক্তচাপ কমিয়ে আনতে পারে। ভিটামিন সি এর এই ক্রিয়াটি তার শারীরবৃত্তীয় এবং জৈবিক প্রভাবগুলির জন্য দায়ী করা যেতে পারে। ভিটামিন সি মূত্রবর্ধক হিসাবে কাজ করে, যা কিডনিকে শরীর থেকে সোডিয়াম এবং জল বের করতে উপযোগী।  ফলে এটি রক্তনালী প্রাচীরের ওপরের সৃষ্টি হওয়া চাপকে কম করতে পারে (3)। একটি ইতালীয় গবেষণা অনুসারে ভিটামিন সি, ভাসোডিলেশন (রক্তচাপ কমানোর রক্তনালীগুলির প্রসারণ) বাড়ায় (4)

৩. শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

শরীরে ভিটামিন সি-এর অভাব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে শরীরে নানা ধরণের সংক্রমণ দেখা দেয় (5)। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রক্ষা করার পাশাপাশি, ভিটামিন সি বিভিন্ন অ্যালার্জির তীব্রতাও হ্রাস করতে পারে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে (6)। এছাড়াও সর্দি কাশি হলে এটি কমাতেও ভিটামিন সি উপযোগী (7)। তবে এটি সর্দি-কাশি প্রতিরোধ করে নাকি তা সম্পর্কে কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি। জানা যায়, এটি হাঁপানির বিরুদ্ধে লড়তে পারে (8)

৪. ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে

অসংখ্য পরীক্ষাগার গবেষণায় দেখা গেছে যে উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন সি প্রস্টেট, লিভার, কোলনে  ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে (9)

৫. অস্টিওআর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা করতে

আর্থ্রাইটিস ফাউন্ডেশনের মতে ভিটামিন সি কিছু ধরণের আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। ভিটামিন সি এর সঠিক ডোজ প্রদাহজনক আর্থ্রাইটিস প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং অস্টিওআর্থারাইটিসের ক্ষেত্রে সাথে জয়েন্টগুলি ঠিক রাখে।

৬. চোখের স্বাস্থ্য উন্নত করে

ভিটামিন সি গ্রহণের ফলে ছানি ছড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। আসলে, ভিটামিন সি এর উচ্চ মাত্রায় গ্রহণের ক্ষেত্রে ছানি হওয়ার ঝুঁকি ২০% কমে যায় (10)। এটি চোখের মণির টিস্যুগুলিকে যেকোনো ধরণের ক্ষতির থেকে রক্ষা করে। এছাড়া ভিটামিন সি চোখের ভিটামিন ই তৈরিতে সহায়তা করতে উপযোগী যা চোখের স্বাস্থ্যকে উন্নত করে।

৭. দাঁতের মাড়িকে ভালো রাখতে

ভিটামিন সি এর ঘাটতিও পিরিওডোনাল রোগ দেখা দিতে পারে, যেমন জিঞ্জিভাইটিস (মাড়ির রোগ) (11)। এটির কারণ ভিটামিন সি মাড়ির নিম্ন স্তরের সংযোজক টিস্যুকে দুর্বল করতে পারে । আসলে ভিটামিন সি এর ঘাটতির একটি প্রাথমিক লক্ষণ হল মাড়ি থেকে রক্তপাত। তাছাড়া দাঁত এবং মাড়ির স্বাস্থ্য অনেকটাই শরীরে ভিটামিন সি-এর পরিমানের ওপর নির্ভর করে (12) ।

৮. অ্যালার্জির চিকিৎসায়

একটি জাপানি গবেষণা অনুসারে, অটোইমিউন রোগ এবং তা সম্পর্কিত অ্যালার্জি ভিটামিন সি  দ্বারাও নিয়ন্ত্রণ করা যায় (13) । হে ফিভারের চিকিৎসায় (যাকে অ্যালার্জিক রাইনাইটিসও বলা হয়) ভিটামিন সি সহায়তা করে।

৯. ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে করতে

টাইপ টু ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভিটামিন সি (১০০০ মিলিগ্রাম) এর নিয়মিত খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় (14)। ভিটামিন সি ডায়াবেটিসের জন্য রক্তনালীগুলির যে ক্ষতি হয় তা রোধ করতে পারে। জাপানের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে ডায়াবেটিস ভিটামিন সি দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে (15) । এই ভিটামিন ইনসুলিন প্রক্রিয়া জাগ্রত করতে সহায়ক।

১০. ভাইরাল ইনফেকশন সারাতে

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, উচ্চ মাত্রার ভিটামিন সি ইন্টারভেনাস ইনজেকশন হিসেবে শিরায় দিলে ভাইরাল ইনফেকশন সারাতে পারে (16) । আগে এই জাতীয় ডোজটি হাম, হারপিস, মাম্পস এবং ভাইরাল নিউমোনিয়ার মতো সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হত। এছাড়া এটি অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে উপযোগী। এছাড়াও, যেহেতু ভিটামিন সি একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, তাই ভাইরাল সংক্রমণের চিকিৎসায় সাহায্য করে।

১১. মুড ভালো রাখে

আপনার মেজাজ বা মুড চনমনে রাখে (17)। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের উপর গবেষণা করে দেখা হয়েছে যে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন সি গ্রহণ করলে মেজাজকে ভালো থেকে । শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ কমাতেও ভিটামিন সি উপযোগী (18)

১২. ওজন কমাতে

পর্যাপ্ত ভিটামিন সি পেলে অনুশীলনের সময় শরীরের ফ্যাটগুলির জারণকে বাড়িয়ে তোলে। সুতরাং, ভিটামিন সি এর অভাব ওজন এবং চর্বি কমাতে বাধা দিতে পারে (19)। ভিটামিন সি শরীরের বিপাক ক্রিয়া বৃদ্ধি করে এবং এটি ওজন কমাতে সহায়তা করে।

১৩. এনার্জি বাড়াতে

কোরিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরে পর্যাপ্ত পরিমান ভিটামিন সি থাকলে স্বাস্থ্যকর কর্মীদের কর্মক্ষেত্রে ক্লান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস হচ্ছে। এছাড়া দেখা গেছে, ভিটামিন সি এর পরিমান যেসব প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের শরীরে কম, তাদের ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার ফলে শারীরিক ক্রিয়াকলাপের পরিমান বেড়ে যায় (20) ।

১৪. ক্ষত নিরাময়ে

প্রাথমিক কিছু প্রমাণ থেকে জানা যায় যে ভিটামিন সি ক্ষত নিরাময়ে উন্নতি ঘটাতে পারে এবং মারাত্মক পোড়া রোগীদের বায়ুচলাচলের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করতে পারে। ভিটামিন সিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলি পোড়া ক্ষতগুলি নিরাময়ে সহায়তা করে (21) ।

ভিটামিন সি এর ঘাটতি প্রতিরোধ কিভাবে করবেন ?

নিয়মিত ভিটামিন সি যুক্ত ফল যেমন লেবু খান। প্রয়োজনে ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে এর সাপ্লিমেন্ট খান।

জানলেন তো, এর কত গুণ। তাই শরীরে সঠিক পরিমানে ভিটামিন সি প্রবেশ করতে দিন। নিজের যত্ন করুন ও সুস্থ থাকুন ।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী :

কোন খাবারে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন সি থাকে ?

লেবু জাতীয় ফলে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন সি থাকে।

কি করে আরও বেশি ভিটামিন সি শরীরে প্রবেশ করানো যায় ?

এর জন্য ভিটামিন সি -এর সাপ্লিমেন্ট নিতে হবে।

ভিটামিন সি কি প্রত্যেকদিন খাওয়া যায় ?

হ্যাঁ, ভিটামিন সি প্রত্যেকদিন খাওয়া যায়।

ভিটামিন সি ও জিঙ্ক একসাথে খাওয়া যায় ?

ভিটামিন সি ও জিঙ্ক একসাথে খাওয়া যায়।

লেবু বেশি সেদ্ধ করলে কি তার ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায় ?

হ্যাঁ, লেবু বেশি সেদ্ধ করলে তার ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়।

ভিটামিন সি খাওয়ার সঠিক সময় কি ?

ভিটামিন সি খাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই।